রাজশাহীর সেই নারী, যিনি ২০টির বেশি কুকুর-বিড়ালের মা হয়ে উঠেছেন!
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার রঘুরামপুর গ্রামের রওশন আরা সেই নারী, যিনি স্থানীয় পথের কুকুর ও বিড়ালদের “মা” নামে পরিচিত। ৪৭ বছর বয়সী রওশন আরা তার দয়ালু ও দায়িত্বশীল মনোভাবের কারণে গ্রামের মানুষের কাছে পরিচিত।
তিনি নিজ বাড়ি এবং আশেপাশের পাঁচটি স্থানে নিয়মিতভাবে প্রায় ২০টি কুকুর ও ৯টি বিড়ালকে খাবার ও যত্ন দেন।
পথের প্রাণীদের প্রতি মমতা
রওশন আরার জীবনে সবচেয়ে কষ্টের সময় আসে তখন, যখন গ্রামের কেউ কুকুরের জন্য অভিযোগ জানায়। একবার রিকশাচালককে তার কুকুর বল্টু আতঙ্কিত করায় চালক গর্তে পড়ে যান।
এই ঘটনায় তিনি দুই মাস দিনভর কুকুরদের খাবার দিতে পারেননি। পরে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাহায্য নেন এবং নিশ্চিত হন, কোনো কুকুর মানুষকে ক্ষতি করতে পারলে তিনি আর খাবার দেবেন না।
রওশন আরার বাড়িতে বর্তমানে ৯টি বিড়াল ও ৭টি কুকুর আছে। সবকিছুই রাস্তা থেকে উদ্ধার। তিনি প্রাণীদের জন্য নিজ খরচে টিকা দেন, বিশেষত প্রজনন মৌসুমে। কারণ, নতুন বাচ্চা কুকুর-বিড়ালকে অনেকেই মারার চেষ্টা করে, যা তিনি সহ্য করতে পারেন না।
কিভাবে জন্ম নিল পথের মমতা
পাঁচ বছর আগে একটি অসুস্থ ও গর্ভবতী কুকুর তার বাড়িতে ঢুকে পড়ে। দয়ালু রওশন আরা তা খাদ্য ও যত্ন দিয়ে সুস্থ করে তোলে। সেই কুকুরটির নাম দেন ‘দুলি’। পরে আরেকটি কুকুর এসে পানিতে লুটিয়ে পড়ে, নাম দেন ‘মায়া’। বাকি কুকুর ও বিড়ালগুলো তিনি রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে কুড়িয়ে আনেন।
রওশন আরা তার কুকুরগুলোকে আলাদা নাম দিয়েছেন বাঘা, পুটুস, দুলি, লালু, ময়না, পেয়ারা, টুসি। বিড়ালগুলোর নাম টুকটুকি, প্রজাপতি, টুকি, তনুমনু, বল্টু, মিঠু, রাজা, গুড্ডু, টম।
বিড়ালদের জন্য প্রতিদিন প্রায় এক কেজি মাছ কেনা হয়। কুকুরের জন্য ভাত এবং কম দামের সবজি সংগ্রহ করেন। বিয়েবাড়ির খাবারের বর্জ্যও কুকুরদের জন্য ব্যবহার হয়।
সামাজিক দায়িত্ব ও অন্যান্য উদ্যোগ
রওশন আরা কেবল নিজের বাড়িতেই নয়, গ্রামের আরও পাঁচটি স্থানে কুকুরদের খাবার দেয়। এসব স্থানে খাবারের পাত্র রাখেন এবং স্থানীয়দের সুরক্ষার দায়িত্বে রাখেন। অসুস্থ কুকুর বা বিড়াল দেখলে নিজের কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ওষুধ এনে দেন।
গত শীতে তিনি ১৮টি বিড়াল পালন করতেন; সেগুলোর মধ্যে ৯টি ‘ক্যাট ফ্লু’ রোগে মারা যায়। এছাড়া একটি কুড়িয়ে পাওয়া ইগলকে সাত মাস ধরে বাড়িতে রেখে সুস্থ করেছিলেন।
প্রাণীর ভালোবাসা ও প্রেরণা
রওশন আরা বলেন, “আমার একটাই দুঃখ, আমি বিড়ালদের ক্যাটফিস খাওয়াতে চাই, কিন্তু টাকা জোগাড় করতে পারি না।”
প্রতিদিন গ্রামে ঘুরে কুকুর-বিড়ালদের খাবার দেওয়া এবং সেগুলোকে যত্ন করা তার জীবনের অংশ। কুকুর-বিড়ালের কাছ থেকে প্রাপ্ত ভালোবাসাই তাকে শক্তি ও প্রেরণা জোগায়।
FAQs: রাজশাহীর সেই নারী, যিনি ২০টির বেশি কুকুর-বিড়ালের মা হয়ে উঠেছেন!
১. রওশন আরা কতো বছর ধরে পশুদের যত্ন করছেন?
প্রায় পাঁচ বছর ধরে।
২. তিনি কিভাবে কুকুর-বিড়ালদের খাবার জোগাড় করেন?
নিজের বাড়ি থেকে, বাজার থেকে সবজি, ভাত এবং মাছ সংগ্রহ করে। বিয়েবাড়ির খাবারের বর্জ্যও ব্যবহার করেন।
৩. রওশন আরার স্বজনরা কীভাবে সহায়তা করেন?
তার পরিবার পশুপ্রেমে সমর্থনী, বিশেষ করে দুই ছেলে। বড় ছেলে পুলিশে কর্মরত, ছোট ছেলে সহায়ক।
৪. অসুস্থ প্রাণীদের জন্য তিনি কী ব্যবস্থা নেন?
নিজের কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ওষুধ এনে সঠিক চিকিৎসা দেন।
শেষ কথা
রওশন আরা প্রমাণ করেছেন যে মানুষের সহানুভূতি এবং প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা সমাজে প্রেরণার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। তার উদারতা শুধু কুকুর-বিড়ালের জন্য নয়, পুরো গ্রামের জন্যই শিক্ষণীয়।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো

